কনকনে শীতের ভিতর ক্যালেন্ডারের পাতায় যুক্ত হয় আরও একটি বছর
বার্তা সম্পাদক প্রকাশিত: ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ , ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, বুধবার , পোষ্ট করা হয়েছে 5 months আগে
তীব্র ও কনকনে শীতের ভেতর, ক্লান্ত ও অবসন্ন এক বাস্তবতায় আমাদের জীবনে এসে হাজির হয় ইংরেজি নতুন বছর। ক্যালেন্ডারের পাতায় যুক্ত হয় আরও একটি বছর, অথচ জীবনের খাতা থেকে নীরবে ঝরে পড়ে আরেকটি অধ্যায়। নতুন বছর মানেই কেবল আলো, উৎসব কিংবা আতশবাজি নয়। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় এক কঠিন অথচ অস্বীকার্য সত্য: আমরা মৃত্যুর আরও এক ধাপ কাছাকাছি এগিয়ে যাই।
এই শীতেই আমাদের দেশে অসংখ্য গরিব ও অসহায় মানুষ একটি কম্বল ছাড়া খোলা আকাশের নিচে রাত কাটায়। তারা নতুন বছরে পা রেখেছে ঠিকই, কিন্তু দু’বেলা খাবারের নিশ্চয়তা তাদের জীবনে নেই। অথচ আমরা, আপনি বা আমি সর্বোচ্চ হয়তো ৫০ থেকে ৭০ বছরের বেশি বাঁচব না; তবুও আমাদের চাহিদার যেন কোনো শেষ নেই। অর্থ ও ক্ষমতার লোভে অনেকেই দরিদ্র মানুষের বুকে পা রেখে কোটিপতি হয়েছে। কিন্তু এই সম্পদের প্রকৃত মূল্যই বা কী? মৃত্যুর পর অন্ধকার কবরে সঙ্গে যাবে কেবল কাফনের কাপড়, চাটাই ও কিছু বাঁশ আর মাটির নীরবতা, এর বাইরে কিছুই নয়।
অর্থলোভের মোহে পড়ে মানুষ মৃত্যুর বাস্তবতা ভুলে যায়। বছর আসে, বছর যায়; চাহিদা বাড়ে, অথচ জীবন থেকে একটি করে বয়স কমে। তবুও কোটিপতি হওয়ার দৌড় থামে না। নতুন বছর শুরু হওয়া উচিত আত্মসংযম, আত্মসমালোচনা এবং সৃষ্টিকর্তার স্মরণে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায় মদ্যপান, ভোগ-বিলাস ও অনৈতিক আনন্দে নারীর সঙ্গে রাত কাটানো হয়। খুব কম মানুষই মনে রাখে, জন্মের পর থেকে প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব একদিন আল্লাহর দরবারে পাই-পাই করে দিতে হবে।
এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার মোহে আমরা যেন ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে যাচ্ছি। মুসলিম উম্মাহর চূড়ান্ত গন্তব্য দুনিয়া নয় আখিরাত। সেখানেই দুনিয়ার সব কর্মের পূর্ণ হিসাব হবে। কর্মের মাধ্যমে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার সৌভাগ্য সবার কপালে জোটে না। অনেকেই কালো টাকা ও ক্ষমতার জোরে বাহ্যিক সম্মান পায়; সামনে ভালোবাসা দেখালেও পেছনে জমে থাকে মানুষের অভিশাপ। এমন জীবনের মূল্য কতটুকু, যেখানে মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসার বদলে ঘৃণা বাসা বাঁধে?
নতুন বছর আমাদের সামনে আরও অনেক কিছু নিয়ে আসবে সাফল্য ও ব্যর্থতা, হাসি ও অশ্রু। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হওয়া উচিত, মানুষ যেন মানুষই থাকে; অমানুষ হয়ে না যায়। নতুন বছর কেবল শুভেচ্ছার বাক্য নয় এটি আত্মশুদ্ধির অঙ্গীকার। জীবন থেকে একটি বছর চলে যাওয়া মানেই মৃত্যুর আরও কাছে যাওয়া এই সত্য মেনে নিয়ে মানবিক কাজ ও কর্মের মধ্য দিয়েই প্রকৃত অর্থে বেঁচে থাকা সম্ভব।
মানুষ সাধারণত নতুন বছরকে আনন্দ, উদযাপন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সময় হিসেবে দেখে। কিন্তু কোরআনের দৃষ্টিতে নতুন বছর মানে মৃত্যুর নির্ধারিত সময়সীমার আরও কাছে পৌঁছে যাওয়া।
আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন- “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” -সূরা আলে ইমরান (৩:১৮৫)
এই মৃত্যু কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়; বরং সময় ধরে এগিয়ে আসা এক অবশ্যম্ভাবী গন্তব্য। নতুন বছর মানে সেই গন্তব্যের পথে আরেকটি মাইলফলক অতিক্রম করা।
আল্লাহ আরও বলেন- “যেখানেই তোমরা থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের ধরে ফেলবেই—যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান কর।” -সূরা আন-নিসা (৪:৭৮)
গরিব ও অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া, লোভের পরিবর্তে সংযমকে গ্রহণ করা এই পথেই রয়েছে অন্তরের প্রকৃত শান্তি। নতুন বছরে আমাদের স্বপ্ন হোক ভালো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার; এমন জীবন, যা মানুষের দোয়া কুড়ায়, অভিশাপ নয়। এমন জীবন, যা মৃত্যুর পরও মানবিকতার উজ্জ্বল স্মৃতি রেখে যায়।
অর্থাৎ, বছর বদল হোক কিংবা যুগ বদল মৃত্যু কখনো থেমে থাকে না। আমরা যতই ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর থাকি না কেন, সময় আমাদের নীরবে কবরের দিকে এগিয়ে নেয়।
নতুন বছর হোক আল্লাহকে স্মরণ করে শুরু করার বছর। সৎ কর্ম, ন্যায়, মানবিকতা ও তাকওয়ার পথে চলার দৃঢ় অঙ্গীকারই হোক আমাদের সবার প্রত্যাশা।
ইঞ্জিঃ মো. আজহার উদ্দিন,
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান-
Brahmanbaria Batighar – ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর।































আপনার মন্তব্য লিখুন