২৫শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

EN

কোটা আন্দোলন শিক্ষার্থীর কাছে জীবন–মারণ

বার্তা সম্পাদক

প্রকাশিত: ২:৩০ অপরাহ্ণ , ৮ জুলাই ২০২৪, সোমবার , পোষ্ট করা হয়েছে 2 weeks আগে

ডেস্ক রিপোর্ট: সরকারি চাকরিতে কোটা থাকা না-থাকার ইস্যুটি আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে যেন জীবন-মরণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৮ সালে সরকারের জারি করা পরিপত্র পুনর্বহালসহ কয়েকটি দাবিতে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের আন্দোলন এখন শুধু ঢাকা শহরেই সীমাবদ্ধ নেই, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।

সরকারি চাকরিতে কোটাপদ্ধতি চালুর ইতিহাসটি অবশ্য বেশ পুরনো। স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন শ্রেণির চাকরিতে কোটাব্যবস্থা চলে আসছিল। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ২০ শতাংশ পদে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ করা হতো। বাকি ৮০ শতাংশ পদে কোটায় নিয়োগ হতো। ১৯৭৬ সালে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়। ১৯৮৫ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে ৪৫ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের নিয়ম চালু করা হয়। বাকি ৫৫ শতাংশ অগ্রাধিকার কোটায় নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ, জেলাভিত্তিক কোটা ১০ শতাংশ, নারীদের জন্য ১০ শতাংশ এবং ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’র জন্য ৫ শতাংশ কোটা ছিল। পরে ১ শতাংশ কোটা প্রতিবন্ধীদের জন্যও নির্ধারণ করা হয়। কোটা ব্যবস্থা নিয়ে প্রবল আন্দোলন শুরু হয় ২০১৮ সালে। কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালের অক্টোবরে নবম থেকে ১৩তম গ্রেডের (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি) সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করেছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

পরে ২০২১ সালে সেই পরিপত্রের মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের অংশটিকে চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান রিট করেন। ৫ জুন এই রিটের রায়ে পরিপত্রের ওই অংশ অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে আবার আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’–এর ব্যানারে ১ জুলাই থেকে টানা আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। এই আন্দোলনের কারণে ঢাকা শহরে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ এ ব্যাপারে সরকার কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করছে না। আন্দালনকারীরাও ক্রমেই চরম কর্মসূচির দিকে ঝুঁকছে।

কোটা নিয়ে সরকারের ভূমিকাও খুব একটা স্বচ্ছ নয়। এর আগে আন্দোলনের মুখে সরকার যখন পুরো কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে, তখন কিন্তু কোটা সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সরকার আন্দোলনকারীদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে পুরো কোটাব্যবস্থাই বাতিল করেছে। ফলে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, নারী ও পিছিয়েপড়া জাতিগোষ্ঠী-সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। ২০১৮ সালে কোটা ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল না করে সংস্কারের সুযোগ ছিল। একটা যৌক্তিক হারে কোটা বহাল রাখলে সম্ভবত বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

উচ্চশিক্ষা আর সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা বা সংরক্ষণ নিয়ে আমাদের দেশে স্পষ্ট দুটি পক্ষ তৈরি হয়েছে। ‘আমরা’ আর ‘তারা’। যারা কোটা তুলে দেওয়ার পক্ষে, তারা মনে করেন যে, কোটাভুক্তরা যথেষ্ট যোগ্য না হয়েও পড়াশোনা বা চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন। ‘আমাদের’ মুখের গ্রাস ‘তারা’ কেড়ে নিচ্ছেন, মানে আমাদের চাকরির সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছেন। ‘গ্রাস’-টা যে শুধু আমাদেরই ছিল, অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরির প্রতিটি ক্ষেত্রে শুধু ‘আমাদের’ প্রতিনিধিদেরই দেখা যাবে, এটাই আমাদের সযত্নলালিত ধারণা, কারণ আমরাই যোগ্য। ‘তারা’ ‘আমাদের’ মতো যোগ্য হয়ে আমাদের সঙ্গে লড়ে চাকরি পাক। তাদের জন্য সংরক্ষণ নয়।

সাদা চোখে দেখলে এই দাবির মধ্যে কোনো দোষ খুঁজে পাওয়া যায় না। মেধার ভিত্তিতে লড়াই হবে, সেখানে যোগ্যরা বিবেচিত হবে, তাতে কারও কিছু বলার থাকবে না। যদিও বাস্তবে এটা ‘ন্যায্যতাপূর্ণ’ হয় না। কারণ যারা পিছিয়ে পড়া, তারা তথাকথিত মেধার দৌড়ে অংশ নিতে পারেন না। কারণ তারা সমান সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারেন না। স্কুলে তারা সমান সুযোগ পান না। অভাবের সংসারে বাবা-মাও পড়াতে পারেন না। তাই তারা ও-ধারেই থেকে যাবেন। যদি তা না হতো, তাহলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংরক্ষিত শ্রেণির প্রতিনিধি আজও এত কম হতো না। অর্থাৎ, তারা নিজেরা উঠে আসতে পারছেন না, আর আমরাও তাদের দেখতে চাইছি না। এই দুইয়ের ফল হলো তাদের অদৃশ্য রয়ে যাওয়া।

যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কয়েকটা কথা বলতেই হয়। শিক্ষা বা চাকরির ক্ষেত্রে সংরক্ষণ শুধু ঢোকার পথটা একটু সহজ করে দেয়, বেরোনোটা কিন্তু একই রকম থাকে। সিলেবাস, চাকরিবিধি, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি একই রকম থেকে যায়। আমাদের দেশে বেকারত্বের চাপ অনেক বেশি থাকায় বিভিন্ন ভর্তি পরীক্ষায় তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়। সংরক্ষিত ছাত্রছাত্রীরা সেখানে হয়তো কিছু সুবিধা পেয়ে থাকেন। কিন্তু এর মাধ্যমে যে সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তি মজবুত হয়। পিছিয়ে পড়ারা এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। সমাজের সব গোষ্ঠীর লাভবান হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত হয়।

 

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্কাইভ

July 2024
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
আরও পড়ুন