২৭শে জানুয়ারি, ২০২৩ ইং | ১৪ই মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

EN

সামাজিক শ্রেণীবৈষম্য দূরীকরণ কেন জরুরি

বার্তা সম্পাদক

প্রকাশিত: ১০:০৬ অপরাহ্ণ , ২৩ ডিসেম্বর ২০২২, শুক্রবার , পোষ্ট করা হয়েছে 1 month আগে

উন্নয়নশীল আটটি দেশের আন্তঃউন্নয়ন সহযোগিতার জন্য গঠিত হয়েছিলো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা যার নাম ডি-৮। এই জোটের সদস্য দেশগুলো হচ্ছে- বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইরান, তুরস্ক, মিসর, ইন্দোনেশিয়া এবং নাইজেরিয়া। ভৌগোলিকভাবেও এই জোটের সদস্য দেশগুলোর অবস্থান একসাথে নয় বরং অনেকটা বিচ্ছিন্ন। তাদের একক কোনো স্বার্থ নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘর্ষ যেমন রয়েছে তেমনি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে নানা বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যও। যেমন : বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের স্বার্থে বড় ধরনের দূরত্ব নতুন কোন বিষয় নয় বরং অনেক পুরোনো ব্যাপার। অাবার অন্যদিকে দেশগুলোর মধ্য অর্থনৈতিক অবস্থানেও রয়েছে বিস্তর ফারাক।

সমাজিক স্তর বিন্যাসের প্রভাব উন্নয়নশীল এই দেশ গুলোতে প্রকট। ধারণা করা হয় সামাজিক অসমতা থেকেই সাধারণত স্তরবিন্যাস এর সৃষ্টি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় সমাজে কেবল দুটি শ্রেণিই বিরাজ করছে। একটি শাসক শ্রেণী আরেকটি শোষিত সমাজ। এর একটি হলো যারা সমাজের অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রন করছে এবং একচ্ছত্র পুঁজির উপর নিয়ন্ত্রন রাখছে। অপরটি হলো যারা নিরন্তর শোষিত হয়েই চলেছে। বর্তমান সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামাজিক অসমতার বিষয়টি ব্যাপক পরিলক্ষিত হয়। সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা শুনা গেলেও আসলেই কি তা হচ্ছে? সামাজিক বৈষম্য মহামারীর আকার ধারণ করেছে একথা নতুন করে বলার কিছু নেই। রাষ্ট্রীয় সেবা গ্রহণেও পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। কেবলমাত্র ভুক্তভোগীই জানেন নিদারুণ কষ্টের কথা। পদ-পদবী, সেবার দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় সর্বত্রই শ্রেণীবৈষম্য কিংবা অসমতা। সমাজে যারা ভালো অবস্থানে রয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে যারা সাবলম্বি অথবা উচ্চবেতনের একটি চাকরি যোগাড় করতে পেরেছে কেবল তাদের বেলায় জুটছে রাষ্ট্রীয় কিংবা সামাজিক সম্মান। আর যাদের ন্যূনতম একটি আয় রোজগারের ব্যবস্থা নেই, মাথা গোঁজার মতো একটু ঠাঁই নেই, পরিধান করার মতো পর্যাপ্ত কাপড়ও নেই তাদের কথা কি কেউ একবার ভাবে? তারা কি মানুষ নয়? তারা কি সমাজের অংশ নয়? বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সাধারন জনগোষ্ঠি তাদের অবস্থানের পরিবর্তন করতে পারে না। আর সামাজিক বৈষম্যের কারনে কর্মক্ষেত্রে তাদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় না। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দ্বারা নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের অপদস্থ হওয়ার কথা তো বলাই বাহুল্য।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্তরবিন্যাস একটি অনিবার্য বিষয়। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে সামাজিকভাবে সকল শ্রেণির মানুষকে সমান মূল্যায়ন করা হয়। যার ফলে দেশগুলো অর্থনৈতিক ভাবে যেমন স্বচ্ছল তেমনি সামাজিক অবমূল্যায়নও খুব একটা পরিলক্ষিত হয়না। সম্মান না টাকা? কারো কারো কাছে টাকা হয়তো বড় কিছু হতে পারে আবার কারো কারো সম্মানের কাছে টাকা একেবারে নস্যি। অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন সম্মানই যদি না টিকলো টাকা দিয়ে হবেটাই বা কি? তাই টাকা না সম্মান এই বিতর্কে না হয় নাই গেলাম। সবাই নিজ নিজে প্রাপ্য সম্মানটুকু পাক এটুকুতো নিশ্চিত করতে পারি আমরা? সামাজিক মূল্যবোধ বৃদ্ধি ও সুষ্ঠু সমাজ গঠনে সামাজিক শ্রেণী বৈষম্য দূরীকরণের কোন বিকল্প নেই।

আইনের চোখে রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। সকল নাগরিকের সমান অধিকার পাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তাই রাষ্ট্রীয় সেবাগ্রহণে শ্রেণীবৈষম্য গ্রহণযোগ্য নয়। সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হওয়া চাই। সমাজের একটি বিরাট অংশের সামাজিক মর্যাদাকে খোটো করে দেখার কোন অবকাশ নেই। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে সকল মানুষের সমান প্রবেশাধিকার না থাকাই সৃষ্টি করে সামাজিক অসমতার। সামাজিক অসমতার নেতিবাচক প্রভাব ব্যাপক। যার ফলে অামরা সুস্পষ্ট দেখতে পাই সমাজিক বৈষম্য ও সামাজিক বৈকল্য। এর ফলাফল হিসাবে সামাজিক অস্থিরতা, বেকারত্বের হার, জন অসন্তোষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নয়শীল দেশগুলোতে জীবনমান ধরে রাখতে মানুষকে দিন রাত লড়াই করতে হচ্ছে৷ তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের মৌলিক চাহিদা গুলোও মেটানো সঠিক ভাবে সম্ভব হয়ে উঠছে না৷ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতেই যদি অবস্থা হয় তথৈবচ; তবে অন্যান্য চাহিদা মানুষ পূরণ করবে কখন?

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মমূখী শিক্ষার প্রচলন কম। সামাজিক স্ট্যাটাস যাদের ভালো তারাই কেবল সকল ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায়। শুধু মাত্র কর্মসংস্থানে যোগদান নয়, দেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজের বিশাল একটি অংশ বেকার যাদেরকে সাবলম্বী, স্বনির্ভর হিসেবে গড়ে তুলতেও প্রয়োজন আছে কর্মমূখী শিক্ষার। বেকারত্ব দূরীকরণ সম্ভব হলে কর্মক্ষম শিক্ষিত তরুণ সমাজের সামাজিক মর্যাদাও বৃদ্ধি পাবে। সামাজিক অসমতাকে একপাশে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ যে যুবক-যুবতী বেকার অবস্থায় রয়েছে তাদেরকে এই গঠনমূলক ও কর্মমূখী শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে উৎসাহ সৃষ্টি এবং তা যথাযথ বাস্তবায়ন করতে পারলে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা সম্ভব। সর্বোপরি, দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখা সম্ভব।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেকারত্বের হার যেমন বেশি আবার চাকরির বাজারের সাথে শিক্ষাব্যবস্থাও তেমন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়৷ এসব অসংগতি অবিলম্বে দূর করতে হবে। সামাজিক অসমতা নিয়ে ভ্রান্ত ধারনা রয়েছে শিক্ষিত সমাজের যার ফলে তারা আত্নকর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকে না ঝুঁকে বরং চাকরি করার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যায়। পারিবারিক অসহযোগিতাও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় একজন শিক্ষিত বেকার যুবককে চাকরি খোঁজার জন্য যতটুকু উৎসাহ, উদ্দীপনা দেওয়া হয় এর ছিঁটেফোঁটাও দেয়া হয়না বেকার যুবক নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাইলে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এমনিতেই কর্মসংস্থান সুযোগ সীমিত। যার ফলে বেকারত্ব সমস্যা লাঘব সহজ হচ্ছে না৷ ধনী-গরিব বৈষম্যও রোধ করা যাচ্ছে না।

অতএব, উন্নয়শীল দেশগুলোতে সামাজিক অসমতা দূর করতে সরকারি, বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, জাতীয় ও আন্তর্জাজিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজনীয়। বেকারত্বের সমস্যা লাঘব করতে কর্মমূখী শিক্ষা প্রদান ও আত্নকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা বাঞ্চনীয়। তাছাড়া দেশের উন্নয়ন বহাল রাখা সম্ভবপর নয়। তাই সরকারকেও এই সকল দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে, বেকার যুবক-যুবতীদের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। বেকার যুবকদের আত্নকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বেকার যুবক-যুবতীরা উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ চায়, বেকার ভাতা নয়। পরিশেষে বলা যায়, এই সামাজিক অসমতা থেকে বের হতে আসতে সমন্বিত সমাধান সূত্র দরকার।

লেখক:মো. মিকাইল আহমেদ শিক্ষার্থী, আইসিএমএবি, ঢাকা।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্কাইভ

December 2022
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  
আরও পড়ুন