২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ ইং | ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

EN

ওরা কি করোনাকেও হার মানায়?

বার্তা সম্পাদক

প্রকাশিত: ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ , ২ এপ্রিল ২০২০, বৃহস্পতিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 2 years আগে

 

এইচ.এম. সিরাজঃ করোনা। বাংলা ভাষায় তিন বর্ণের এই শব্দটি অনেকটা মানবিকতা বোধকেই বোঝায়। কিন্তু কভিড-২০১৯ তথা করোনা ভাইরাস’র কারণে ‘করোনা’ শব্দটির শাব্দিক অর্থটাই যেনো পাল্টে দিয়েছে। করোনা এখন অনেকটা অাতঙ্কিত শব্দ। অাজ গোটা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করছেন করোনার দোর্দণ্ড দাপট।শুধু প্রত্যক্ষ করছে এমনটাই-বা বলি কি করে! করোনার ভয়াল থাবার শিকারে মানব সভ্যতাই এখন হুমকির মুখে। তবে হ্যা, এটিও ঠিক যে, এই করোনা মানুষে মানুষে ভেদাভেদকে কমিয়ে এনেছে অনেকটা। অনেকেই বিভেদ ভুলে গেছে। সব বিভেদকে পাশ কাটিয়ে করোনা ঠেকাতেই হয়ে ওঠেছেন মরিয়া। কিন্তু এরকমের মহামারীময় দশাতেও যারা দলবদ্ধ হয়ে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত অবস্থায় যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়!

সংসার জীবনে চাওয়া-পাওয়ার হিসেব নিয়ে গরমিল, বিবাদ-বিসম্বাদ থাকবেই। কিন্তু এসবেরও সময়-অসময় অাছে বৈ কি। মানুষ মাত্রেই অাপদকালীন সময়কে খুব মেনে চলে, এটাই স্বাভাবিকতা। অার প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগময় মুহূর্তে মানুষ অন্য সময়ের তুলনায় অারেকটু বেশিই মানবিক হবেন, এটাই তো মনুষ্যত্ববোধের অন্যন্য উপাদান বটে। একাত্তরে অামাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে জীবন রক্ষায় ড্রেন-নর্দমায় কীট-পতঙ্গের সাথেও নাকি মুত্তিযোদ্ধারা পড়ে থেকেছে। বিষধর সাপও নাকি কদাচ শরীরের উপর দিয়ে বেয়ে গেছে, দংশন করেনি। অনেক মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে এমন লোমহর্ষক গল্প শুনেছি। অার মানুষের বেলায় তো কথাই নেই। কোনোরকমের জাত-পাত, ধনী-দরিদ্রের বাঁধা-বিঘ্ন ছিলো না। সর্বোচ্চ রকমের মানবিকতা দেখাতেও কেউ করেনি কুণ্ঠাবোধ। অথচ করোনা ভাইরাসের অাতঙ্কে গোটা মানবকূলই যেখানে নিদারুণ অসহায় বোধ করছে, এমনি সময়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়ানো কেমন হীনমন্যতা? অথচ বাস্তবে তাই ঘটলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা এলাকায়, তাও অাবার দুই জনপ্রতিনিধির মধ্যে!

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত অত্যাবশ্যক। সরকার সব রকমের জনসমাগম ঠেকাতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছেন। এক ধরণের লকডাউন দশা বিরাজমান। এমন সঙ্কটকালে সাধারণত বাড়িঘরের পানি নিস্কাশন নিয়ে দুই মেম্বারের লোকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ! শুনতেই যেনো কেমন লাগে। বাস্তবিকতায় শ’ শ’ মানুষ সংগবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র লড়াইয়ে নামলো একই গ্রামের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। এতে আহত হলো অর্ধশতাধিক মানুষ। পরিস্থিতি যখন নিতান্তই হয়ে পড়লো বেসামাল,তখন থানা পুলিশকে ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যাপক লাঠিপেটা করাসহ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করতে হলো। শুধু কি তাই? পরবর্তীতেও ফের সংঘাতের অাশঙ্কায় এলাকায় মোতায়েন করে রাখতে হলো অতিরিক্ত পুলিশ।

খবরে প্রকাশ, ৩১ মার্চ মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর নাগাদ দফায় দফায় সংঘর্ষ হয় সরাইল উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের ভূইশ্বর গ্রামের বাসিন্দা-ইউপি সদস্য (মেম্বার) মলাই মিয়া এবং সাবেক মেম্বার নাছির উদ্দিনের লোকজনের মধ্যে। স্থানীয় এলাকাবাসী এবং পুলিশ সূত্রে প্রকাশ, ওই গ্রামের বাসিন্দা সাবেক মেম্বার নাছির উদ্দীনের ভাই শাহাব উদ্দিনের বাড়িঘরের পানি যাওয়াকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার সকালে বর্তমান মেম্বার মলাই মিয়ার সাথে প্রথমে বাদানুবাদ থেকে পরে কথা কাটাকাটি হয়। এরই একপর্যায়ে উভয় পক্ষের শত শত মানুষ করোনা ভাইরাসের মতো ভয়ানক মহামারিকেও উপেক্ষা করেই দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে অরুয়াইল ফাঁড়ি পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রচেষ্টা চালিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে।

কিছু সময় অতিবাহিত হতে না হতেই দুই মেম্বারের ফের সংঘর্ষে জড়ায়। দুপুর নাগাদ চলে দফায় দফায় সংঘর্ষ। পরিস্থিতি বেসামাল হওয়ায় সরাইল থানার পুলিশও ঘটনাস্থলে পৌঁছে ব্যাপক লাঠিপেটা করাসহ ৩৮ রাউণ্ড রাবার বুলেট ও বেশ কতেক রাউণ্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।সংঘর্ষকালে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ফলে ও দেশীয় অস্ত্রের অাঘাতে আহত হয় উভয় পক্ষের অর্ধশতাধিক মানুষ। তাদেরকে উপজেলা হাসপাতাল এবং জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। সরাইল থানার পরিদর্শক (ওসি) শাহদাত হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাঠিচার্জ,টিয়ারগ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অানে। পরবর্তী সংঘাত এড়াতে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ।’

কোনো একটি নির্ধারিত এলাকা নয়, একটি উপজেলা, জেলা কিংবা বিভাগ এমনকি একটি দেশও নয়। গোটা বিশ্বজুড়েই এখন করোনা ভাইরাসের বিস্তারের কারণে চলছে মহামারী। মানব সভ্যতা অাজ চরমভাবে হুমকির মুখে। করোনা ভাইরাস নামের মহামারির ছোবল থেকে বাঁচতে মানুষ স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী, তাও নানা রকম উপায় অবলম্বন করেও। করোনা’র ভয়ে সবাই বিহবল। সকল প্রকার জনসমাগম পরিহার তো অবশ্যই, একে অপরের থেকে সামাজিক দূরত্বও বজায় রাখার মাধ্যমেও মানুষ বাঁচার প্রচেষ্টায় চরমভাবেই উদগ্রীব। নিতান্ত প্রয়োজন ব্যতিরেকে কেউ ঘর থেকেও বের হচ্ছেনা। সকল স্তরেই চলছে ভীষণ রকমের জনসচেতনতা গড়ে তোলার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। এমন মহাদুর্যোগকালীন সময়ে শয়ে শয়ে মানুষ সমবেত হয়ে দফায় দফায় সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া মানবতার জন্য কতোখানি হুমকি স্বরূপ? তবে কি ওরা করোনাকেও হার মানায়।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্কাইভ

আরও পড়ুন