২রা আগস্ট, ২০২১ ইং | ১৮ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

EN

প্রবাসেও ভিনদেশের কাছে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে একদল বাংলাদেশী

বার্তা সম্পাদক

প্রকাশিত: ৪:৫৬ অপরাহ্ণ , ২১ নভেম্বর ২০১৮, বুধবার , পোষ্ট করা হয়েছে 3 years আগে

জহির রায়হান, লেবানন থেকে : দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এবার প্রবাসেও দেশের সম্মান ক্ষুন্ন করছে প্রবাসে থাকা একদল বাংলাদেশী। এদের একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকান্ডে ভিনদেশীদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির বারটা বাজার আর বাকি নেই কিছু। মাদক, জুয়া, খুন, পাচার, দালালী, ইয়াবা সেবন, অনৈতিক সম্পর্ক, অবাধ মেলামেশা থেকে শুরু করে এমন কোন অপরাধমূলক কাজ নেই যা তাদের দ্বারা সংগঠিত হয় না। এদের এই এহেন কর্মকান্ডে দূতাবাসও রীতিমতো উদ্বিগ্ন। প্রবাসে থেকেও ভিনদেশের কাছে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে তারা যেন কোমরে গামছা বেঁধে নেমেছে। বলছিলাম মধ্যপ্রাচ্যের দেশ লেবাননের কথা। আর এই লেবানন নিয়েই জহির রায়হান এর সরেজমিন অনুসন্ধানে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।

লেবানন! এটি মধ্যপ্রাচ্যের ছোট্ট একটি দেশ। মূল ভূখণ্ডের চারপাশে রয়েছে ভূমধ্যসাগর আর উঁচু নিচু পাহাড়। পর্যটকদের জন্য এ যেন এক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। লেবাননে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার, বর্ণ ও ধর্মের লোকদের বসবাস। ছোট্ট এই দেশে বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। দূতাবাসের হিসাব অনুযায়ী এ দেশে প্রায় দেড় লাখেরও অধিক প্রবাসী বাংলাদেশীর বসবাস। লেবাননের শ্রমবাজার বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশের সাথে লেবাননের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো জোরদার করতে এ দেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের মান্যবর রাষ্ট্রদূত আব্দুল মোতালেব সরকার অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষনতার সাথে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এজন্য তিনি লেবানিজ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পরিষদের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে প্রতিনিয়ত কোন না কোন বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন।

এছাড়াও দূতাবাস কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের আয়োজনে বাংলাদেশী যে কোন কালচারাল প্রোগ্রামে যোগ দিচ্ছেন এবং বিভিন্ন সভা, সেমিনারের পাশাপাশি মতবিনিময় সভাগুলোতেও দেশের সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখে প্রবাসে কাজ করতে সকল বাংলাদেশীকে প্রতিনিয়ত অনুরোধ জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এতেও কোন লাভ হচ্ছে না। কথায় আছে, “চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী”।

বিগত দিনে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে লেবাননের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছেন অনেক বাংলাদেশী। যার প্রভাব পড়ছে নীরিহ সাধারণ বাংলাদেশীদের উপর।

এদের অপরাধের চিত্র ও ধরণ, যেমন :

এক. দেশ থেকে ইয়াবা এনে নিজে সেবন করা ও এ দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীর কাছে বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করা।

দুই. সমিতি অথবা সি2 নামক সুদের ব্যবসায় নিজেকে নিয়োজিত করে পাওনা অর্থ আদায় কিংবা শরিকদের অর্থ আত্মসাতের জন্য এক বাংলাদেশী অপর বাংলাদেশীকে হত্যার উদ্দেশ্যে ছুরিকাঘাত করা।

তিন. পরকীয়া কিংবা নারী কেলেঙ্কারি অথবা প্রেমিকা ছিনতাইয়ের মত ঘটনায় হিংস্রতায় রূপ নিয়ে এক বাংলাদেশী অপর বাংলাদেশীকে হত্যার উদ্দেশ্যে ছুরিকাঘাত করা।

চার. লেবাননে বসবাসরত অসহায় সাধারণ প্রবাসী বাংলাদেশীদেরকে ভিসা দেওয়ার নাম করে কখনোবা জাল ভিসা দিয়ে আবার কখনোবা ভূয়া ভিসায় বাংলাদেশ থেকে তাদের আত্মীয়স্বজন এনে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা।

পাঁচ. আরেক শ্রেণীর দালাল আছে যারা লেবানন থেকে ইউরোপের উদ্দেশ্যে তুর্কি অথবা গ্রীসে মানব পাচার করে।

ছয়. বাংলাদেশ থেকে গৃহপরিচারিকার কাজে কন্ট্রাকে আসা নারী গৃহকর্মীদেরকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে অথবা অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের লোভ-লালসা দেখিয়ে তাদের মালিকের কর্মস্থল থেকে ভাগিয়ে নিয়ে আসা।

সাত. দেশ থেকে মেয়ে এনে অথবা এ দেশে থাকা অবৈধ মেয়েদের দিয়ে অনৈতিক কাজের জন্য পতিতালয় তৈরি করা।

আট. বৈরুতের বিভিন্ন এলাকাতে জুয়ার আসর বসিয়ে হাজার হাজার ডলার হাতিয়ে নেওয়া।

নয়. আরো একটা হল, ডেকে নিয়ে কোথাও আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করা।

দশ. সামান্য কথা কাটাকাটি থেকে দুই দলের মারামারির ঘটণা হল নিয়মিত বিষয়। এর ফলে এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে পুলিশের নিকট অভিযোগ দায়ের এবং পরবর্তীতে নিরিহ প্রবাসীরা পুলিশের হাতে আটক ইত্যাদি।

সম্প্রতি গত (১১ নভেম্বর) সকাল নয়টার দিকে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের হাজমিয়ে এলাকায় পরকিয়া জেরে এক স্বামী হত্যার উদ্দেশ্যে তার স্ত্রীর গলায় ছুরি চালিয়ে নিজের গলায়ও ছুরি চালায়। পরে স্থানীয় বাংলাদেশীরা তাদেরকে উদ্ধার করে দূতাবাসের সহযোগিতায় হাসপাতালে ভর্তি করলে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই প্রাণে বেঁচে যায়। বর্তমানে তারা সিন-ইল-ফিল ক্যানাডিয়ান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং দু’জনেই সুস্থ আছেন।

এছাড়াও ইতিপূর্বে গত (২ এপ্রিল) রাত আনুমানিক সাড়ে এগারোটায় বৈরুতের আলবস্তা নামক এলাকায় পরকিয়া জেরে দাম্পত্যকলহের একপর্যায়ে স্বামী তার স্ত্রীর গলায় ছুরি চালিয়ে দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে পুলিশ এসে নিহতের লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। এ হত্যাকান্ডের মূল হোতা নিহতের স্বামী আরমান মিয়া (৩১) এবং রবিন (৩০) নামক অপর এক জনকে আটক করেছিল লেবাননের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সম্প্রতি মাস ছয়েক পূর্বে বৈরুতের আইন-আল-রোমানী এলাকায় বাংলাদেশী নারী কর্তৃক অপর তিন বাংলাদেশীর পুরুষাঙ্গ কর্তন হয়েছিল। তবে এই অভিযোগে তেমন কাউকেই আটক করতে শোনা যায় নি।

এছাড়াও চলতি বছরে গত মার্চ মাসের ২৪,২৫,২৬ ও ২৭ তারিখে বাংলাদেশী নয়জন ইয়াবা ব্যবসায়ী লেবাননের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিল।

লেবাননে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের দ্বারা এমন কোন এহেন কাজ নেই যা সংগঠিত হয় নি বা হচ্ছে না। এদিকে বাংলাদেশীদের এমন এহেন কর্মকান্ডে দূতাবাসের মান্যবর রাষ্ট্রদূতও যেন অসহায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মান্যবর রাষ্ট্রদূত আব্দুল মোতালেব সরকার ব্রাহ্মণবাড়িয়া টাইমসের এই প্রতিবেদককে বলেন, বিদেশে প্রবাসীদের এসব কর্মকান্ড দেশের সুনামকে ক্ষুন্ন করছে, দেশের জন্য বদনাম বয়ে আনছে। তাই প্রবাসীদেরকে এধরণের কাজ থেকে বিরত রাখার লক্ষ্যে দূতাবাস বিভিন্নভাবে কাউন্সেলিং করে যাচ্ছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সভা-সমাবেশের মাধ্যমে তাদেরকে দেশের সন্মান ক্ষুন্ন হয় এমন কাজ না করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, প্রায় দেড় লক্ষাধিক প্রবাসী বাংলাদেশী লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। অনেকে দুর্গম এলাকায় কাজ করেন। ফলে সকলের কাছে পৌঁছানো দূতাবাসের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া এত বড় দায়িত্ব কেবল দূতাবাসের একার পক্ষে পালন করা সম্ভব নয়। তাই আমি লেবাননে বসবাসকারী সকল প্রবাসীদেরকে একাজে এগিয়ে আাসার অনুরোধ জানাচ্ছি এবং আবারো সকলকে এসব অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকার আহবান জানাচ্ছি।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্কাইভ

November 2018
M T W T F S S
« Oct   Dec »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  
আরও পড়ুন