৮ই ডিসেম্বর, ২০২২ ইং | ২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

EN

লেবাননে ‘বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন’ নিয়ে আমার যত কথা

বার্তা সম্পাদক

প্রকাশিত: ১১:৩৫ অপরাহ্ণ , ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, শনিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 5 years আগে

লেবানন থেকে জহির রায়হান : ‘বঙ্গবন্ধু’ শুধু একটা নাম নয়, একটা বাংলাদেশ। তিঁনি সমগ্র বাংলার গণমানুষের বন্ধু। বাঙালির জাতির জনক তিঁনি। আজ এই মহান ব্যক্তিকে নিয়ে কিছু লিখার প্রয়াসে কলমটা উঁচিয়ে ধরলাম। আমি একজন মনেপ্রাণে বাঙালি। বাঙালি হিসেবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে প্রাণপণে ভালবাসি। দেশকে ভালবেসে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য যিঁনি নিঃস্বার্থভাবে বারবার নিজেকে অকাতরে বিলিয়ে গেছেন সারাটি জীবন তাঁর কাছে আমরা বড্ড ঋণী। এ ঋণ কিছুতেই শোধ হবার নয়। তবুও শুধুমাত্র তাঁর প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালবাসাটুকু দেখাতে পারলে হয়তো এ ঋণ কিছুটা হলেও শোধ হবে বলে আমি মনে করি।

বর্তমানে আমি লেবানন প্রবাসী। এক চিলতে লেবাননের বুকে “বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন” নামে একটি সংগঠন দেখতে পেয়ে বড্ড ভাল লাগলো। কারণ, বঙ্গবন্ধু শুধু আ’লীগের নয়, তিঁনি সারা বাংলার বন্ধু বটে। বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন এর মূল লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য যেন হয়, এই সংগঠনের মাধ্যমে এদেশের লেবানিজদের কাছে বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস তুলে ধরা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে লালন করে আগামীর পথচলা। এদেশের (বিদেশীদের) মানুষের মুখে যেন শুনতে পাই আমরা গর্বিত বাঙালি, স্বার্থক আমাদের জন্ম, যে দেশে বঙ্গবন্ধু জন্মেছিলেন।

আমরা যারা প্রবাসে থেকেও দেশ, দেশের মানুষ এবং বাঙালি প্রবাসীদের সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনাগুলো মর্মে মর্মে অনুভব করি, কিছু না করতে পারলেও সমবেদনা জ্ঞাপণ করি, এটাও এক ধরণের প্রেম। প্রেম শুধু নারী পুরুষের মধ্যেই সীমিত নয়। দেশ, জাতি ও দেশের মানুষের মঙ্গলের জন্য মানুষের হৃদয়ে প্রেমের যে বহিঃপ্রকাশ ঘটে, মূলত সেটাই প্রকৃত প্রেম।

বাংলাদেশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন দেখেছিলেন…
বঙ্গবন্ধু গড়তে চেয়েছিলেন ‘সুস্থ-সবল, জ্ঞানসমৃদ্ধ, ভেদবৈষম্যহীন মানুষের উন্নত বাংলাদেশ’৷ বঙ্গবন্ধু তাঁরই উদ্ভাবিত ঐ উন্নয়ন দর্শন বাস্তবে রূপ দিতে অন্যতম মৌল-উপাদান হিসেবে সমবায়ের অন্তর্নিহিত শক্তি পুরোমাত্রায় ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন৷ আর সে কারণেই মালিকানার নীতি বিষয়ে সংবিধানের ১৩ অনুচ্ছেদে বলা হলো গুরুত্বক্রম অনুসারে রাষ্ট্রে মালিকানা ব্যবস্থা হবে: প্রথমত, রাষ্ট্রীয় মালিকানা; দ্বিতীয়ত, সমবায়ী মালিকানা, এবং তৃতীয়ত, (নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে) ব্যক্তিগত মালিকানা৷

বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখতেন গ্রামীণ সমাজে সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দেশের প্রতিটি গ্রামে গণমুখী সমবায় সমিতি গঠন করা হবে, যেখানে গরিব মানুষ যৌথভাবে উৎপাদন যন্ত্রের মালিক হবেন; যেখানে সমবায়ের সংহত শক্তি গরিব মানুষকে জোতদার-ধনী কৃষকের শোষণ থেকে মুক্তি দেবে; যেখানে মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীরা গরিবের শ্রমের ফসল আর লুট করতে পারবে না; যেখানে শোষণ ও কোটারি স্বার্থ চিরতরে উচ্ছেদ হয়ে যাবে৷ এমন মহৎ হৃদয়ের উদার মানুষটিই হলেন বঙ্গবন্ধু।

কিভাবে গণ মানুষের বন্ধু হলেন তিঁনি …
৭ই মার্চ ১৯৭১ সাল। রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তাঁর অবিনাশী মহাকাব্য শেষ করলেন৷ ‘‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম৷” এই মহাকাব্যের পর তিনি আর শুধুমাত্র তাঁর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতা রইলেন না৷ তিনি হয়ে গেলেন গণমানুষের শেখ মুজিব, ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা এক মহানায়ক৷ ৭ই মার্চের ভাষণের মধ্যে দিয়েই বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠলেন মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশের জাতির পিতা৷

কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর শুরু হলো নানাভাবে বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের পালা৷ বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবদ্দশাতেই এ সব ঘটনার প্রতিবাদ করেছেন, তার প্রমাণও আছে৷ ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দেয়া বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়৷ যার ফলশ্রুতিতে কিছু পথভ্রষ্ট সেনা কর্মকর্তা কিংবা দেশি-বিদেশি স্বাধীনতাবিরোধী চক্রই শুধু নয়, ১৫ই আগস্টের পট বিশ্লেষণে মোস্তাকসহ তৎকালীন বেশ কিছু আওয়ামী লীগ নেতার নামও সামনে চলে আসে৷

১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ সাল বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক দিন৷ এই দিনটি পুরো জাতির কপালে কলঙ্কতিলক এঁকে দিয়েছে জাতির জনকের খুনি হিসেবে৷ ১৫ই আগস্টের পর একটা দীর্ঘ সময় বঙ্গবন্ধু শব্দটি বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত ছিল৷ ৩০ লক্ষ শহিদের রক্তে রঞ্জিত বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা পরিণত হয়েছিল মৌলবাদী আর সাম্প্রদায়িক হায়েনাদের উচ্ছিষ্ট ভাগাড়ে৷ দীর্ঘ সংগ্রাম আর ত্যাগ তিতিক্ষার পর আবার যখন রক্তাক্ত, পরিত্যক্ত বাংলাদেশকে উদ্ধার করা হলো, তখন শুরু হলো বঙ্গবন্ধুকে দ্বিতীয়বার হত্যার নীলনকশা৷

বঙ্গবন্ধুহীন আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধুকে সীমাবদ্ধ করতে চাইলেন স্লোগান আর পোস্টারের বাণিজ্যিক ব্যবহারে৷ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও উন্নয়ন দর্শনকে তাঁরা নিরাপদ দূরত্বে রেখে আওয়ামী লীগকে পরিণত করতে চাইলেন বণিক শ্রেণির শ্রেণিস্বার্থ রক্ষার এক রাজনৈতিক দুর্বৃত্তে৷ এর ফলে দলটির অধিকাংশ অংশ দখল করে নিলো টাউট-বাটপার, দখলদার, ব্যবসায়ী, আমলা আর ভাড়াটে মাস্তানেরা৷

বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু আর মুক্তিযুদ্ধ – এই শব্দ তিনটি মূলত সমার্থক৷ এই তিনটির যে কোনো একটিকে আলাদা করে বিশ্লেষণ করার কোনো সুযোগ নেই৷ এই তিনটি শব্দের যে কোনো একটি যখন আক্রান্ত হয়েছে, তখনই বাঙালির জীবনে জাতীয় দুর্যোগ নেমে এসেছে৷ বঙ্গবন্ধু ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুটি হতে পারে নিজ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের হাতেই৷ আজ যখন পাড়ার মোড়ে কোনো চিহ্নিত খুনি বা ধর্ষকের ছবির সাথে বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখি, তখন জাতির জনকের ঐ ভবিষ্যদ্বাণীই বারংবার মনে পড়ে৷ তখন রাগে, ক্ষোভে নিজেকে আর সামাল দিতে পারি না।

এরপরেও অবশ্য আমার মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধের ‘সোল এজেন্টশিপ’-এর দাবিদার আওয়ামী লীগকেই সন্ত্রাসী, গডফাদার, টাউট-বাটপারের হাতে ‘নেগেটিভ ব্রান্ডিং’-এর শিকার মুক্তিযুদ্ধ কিংবা বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার করণীয় ঠিক করতে হবে৷ আওয়ামী লীগকেই স্বিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা পুনরায় জাতির জনকের খুনি হিসেবে আবির্ভূত হবে, নাকি গণমানুষের শেখ মুজিবকে ১৬ কোটি মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের ঐতিহাসিক ঋণ শোধ করবে৷ বাংলাদেশকে ভালোবাসলে এই দায় তাদের মেটাতেই হবে, কেন না একমাত্র বঙ্গবন্ধু বাঁচলেই বাঁচবে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ৷

পরিশেষে একটা কথাই বলব, সঠিক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেলে যে কোন সংগঠন সত্যিকার অর্থেই সমাজের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে। বঙ্গবন্ধু সবসময় একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছেন। আমি আশা করি বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে লেবাননে ‘বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন’ নামক সংগঠনটি সক্রিয় অবদান রাখবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্কাইভ

February 2018
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728  
আরও পড়ুন