২রা ডিসেম্বর, ২০২২ ইং | ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

EN

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নাকি পাক-ভারতের! ‘ওরা কি আমাদের বন্ধু নাকি বন্দুক’?

জহির রায়হান

প্রকাশিত: ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ , ২০ ডিসেম্বর ২০১৭, বুধবার , পোষ্ট করা হয়েছে 5 years আগে

জহির রায়হান : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল ১৯৭১ সালে সংঘটিত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সশস্ত্র সংগ্রাম, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে।

২৫শে মার্চের কালোরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর শুরু করা “অপারেশন সার্চলাইট” নামক ধ্বংষযজ্ঞ বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ চলে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এই নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের প্রাণহানি ঘটে এবং ২ লাখ মা-বোনদের ইজ্জতভ্রষ্ট হয়। আরো ১ কোটি মানুষ নিজেদের আত্মরক্ষায় দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন।

শুধু তাই নয়, স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে ১৪ ডিসেম্বর রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্দেশে বাংলাদেশের প্রায় ৩০০জন বুদ্ধিজীবী- যাঁদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী- তাঁদেরকে ধরে নিয়ে যায় এবং নির্মমভাবে হত্যা করে। বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে তারা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রগতির পথ বন্ধ করে দেয়াই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।

লক্ষ লক্ষ শহীদের তাজা রক্ত এবং মা-বোনদের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত বাংলার স্বাধীনতা যদি পাক-ভারতের যুদ্ধ বলে দাবী করে তাদের কি বন্ধু ভাবা যায়? ওরা আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা আমাদেরকে দান সরূপ দিতে চায়! ‘ওরা কি আমাদের বন্ধু নাকি বন্দুক’? আমি বলবো “বন্দুক”!

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ নাকি পাক-ভারত যুদ্ধ! ৪৭তম বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে ভারত এবং বাংলাদেশের দূতাবাসের যৌথ উদ্দ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন অংশগ্রহণকারী ভারত সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল। তিনি আরো বলেন, পাক-ভারত যুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় সেনাবাহিনীদের সহযোগীতা করেছেন মাত্র। শুধু তাই নয়, অনুষ্ঠানে ভারতীয় উইং কমান্ডার ডিজে ক্লের ১২ দিনে ঢাকা বিজয় বইয়ের উন্মোচন করা হয়। বইয়ের পরিচিতিতেও মহান মুক্তিযুদ্ধকে পাক-ভারত যুদ্ধ হিসেবেই লেখা হয়।

আমি বলতে চাই, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এবং ২৬শে মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে যে যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল সেই যুদ্ধ কি পাক-ভারতের যুদ্ধ? তাহলে ২৬শে মার্চ থেকে ৩ ডিসেম্বরের আগে কোথায় ছিলো ভারতের সেনাবাহিনী, কেন তারা বাংলাদেশের হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি? তবে কি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ভারত ছিল? বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের অর্জিত স্বাধীনতা ভারতের নামে নামকরণের “আকাশকুসুম” চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিন। পক্ষান্তরে মিথ্যে বানোয়াট মন্তব্য প্রত্যাহার করে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চান তাতেই মঙ্গল।

ভারত কখন, কিভাবে এবং কেন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতা করেছিলো বিস্তারিত তুলে ধরলাম: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে ক্রমান্বয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়ে পড়ে যে, উপায়ন্তর না দেখে ঘটনা ভিন্ন খাতে পরিচালিত করতে তারা ডিসেম্বরের ৩ তারিখ ভারতের উপর বিমান হামলা চালিয়ে যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক রূপ দেয়ার প্রচেষ্টা চালায়। এ নিয়ে ভারতের দিল্লিতে এক জরুরি মন্ত্রীসভার বৈঠক হয়। মন্ত্রীসভার জরুরি বৈঠকের পর মধ্য রাত্রির কিছু পরে বেতার বক্তৃতায় তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তিনি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বলেন, এতদিন ধরে “বাংলাদেশে যে যুদ্ধ চলে আসছিল তা ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরিণত হয়েছে”। তখন ভারতও এর জবাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে “যুদ্ধাবস্তা” ঘোষণা করে। ঠিক সেসময় থেকে ভারতের সামরিক বাহিনী বাংলাদেশের “মুক্তিবাহিনীর” সাথে যুক্ত হয়ে “যৌথবাহিনী” তৈরি করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।

৪ ডিসেম্বর থেকে ভারতীয় স্থলবাহিনীর সম্মুখ অভিযান শুরু হয় ৪র্থ কোর অভিমূখে। যৌথবাহিনীর প্রবল আক্রমনের মুখে সারা দেশের সীমান্তবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রগুলো থেকে পাকিস্তানিরা পিছু হটতে থাকে। আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণার মাত্র ১৩ দিনের মাথায় যৌথবাহিনী ঢাকার দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। “মুক্তিবাহিনী” ও “ভারতীয় সামরিক বাহিনীর” সম্মিলিত আক্রমণের মুখে ইতিমধ্যে পর্যুদস্ত ও হতোদ্যম পাকিস্তান সামরিক বাহিনী আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

পরে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারা ৯৩ হাজার সৈন্যসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। এরই মাধ্যমে দীর্ঘ নয় মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের অবসান ঘটে ; প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালি জাতির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র আমার প্রাণের বাংলাদেশ।

বিঃ দ্রষ্টব্যঃ ভারত আমাদের বন্ধু হয়ে উপকার করেছে শুধুমাত্র তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিলের লক্ষে। বাকি দিনগুলোও বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে শুধুমাত্র স্বার্থ হাসিলের জন্যই। ওরা আমাদের বন্ধু হতে পারে না তাদের বক্ত্যবে এটাই সুস্পষ্ট এবং তারা নিজেরাই মহান “মুক্তিযুদ্ধ”কে “পাক-ভারত” যুদ্ধ বলে মন্তব্য করে তা প্রমাণ করে দিয়েছে। ওরা আমাদের বন্ধু নয় ‘বন্দুক’।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্কাইভ

December 2017
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
আরও পড়ুন