২৭শে জানুয়ারি, ২০২৩ ইং | ১৪ই মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

EN

অন্তর্জালে অন্তরলোক আমাদের কোনো বিশ্বকবি নেই

বার্তা সম্পাদক

প্রকাশিত: ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ , ৯ মে ২০১৭, মঙ্গলবার , পোষ্ট করা হয়েছে 6 years আগে

আমরা রবীন্দ্রনাথকে বলি, বিশ্বকবি। কেন বলি, আমার ঠিক জানা নেই। গুগল ভাই সব জানেন। গুগল করি। একটা সাইট দেখতে পাচ্ছি—রেডিও স্বাধীন, তারা বলছেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে কেন বলা হয় বিশ্বকবি? কারণ ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি পৃথিবীর এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত যখনই সুযোগ পেয়েছেন, দেখেছেন, শুনেছেন, লিখেছেন সারা বিশ্বের জন্যই।’ আমার ধারণা, রবীন্দ্রনাথের চেয়ে আমি বেশিসংখ্যক দেশে গেছি, আমি না গেলেও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় গেছেন, সুনীলের বইও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, তাই বলে সুনীল তো আর বিশ্বকবি নন।

গুগল সাহেব আরেকটা প্রবন্ধের সন্ধান দিচ্ছেন, এটা বেরিয়েছ মানচিত্র নামের অনলাইন ম্যাগাজিনে, লিখেছেন, আবদুর রশীদ, তিনি বলছেন, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বমানবের জন্য লিখেছেন, তিনি দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করেছেন, আর বিভিন্ন জাতি তাঁকে ব্যাপক সংবর্ধনা দিয়েছে, আর তিনি তাঁর লেখায় গেয়েছেন বিশ্বমানবতার জয়গান, এই জন্য তিনি বিশ্বকবি। চমৎকার একটা উদ্ধৃতিও পাচ্ছি ওই প্রবন্ধে, ‘স্বাজাত্যের অহমিকা থেকে মুক্তিদান করার শিক্ষাই আজকের দিনের প্রধান শিক্ষা। কেননা কালকের দিনের ইতিহাস সার্বজাতিক সহযোগিতার অধ্যায় আরম্ভ করবে।’

রবীন্দ্রনাথ ক্ষুদ্র স্বাদেশিকতার ঊর্ধ্বে উঠতে চেয়েছেন, এটা আমরা জানি। তাঁর গান আছে—

বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো
সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও॥
নয়কো বনে, নয় বিজনে, নয়কো আমার আপন মনে-
সবার যেথায় আপন তুমি, হে প্রিয়, সেথায় আপন আমারও॥
সবার পানে যেথায় বাহু পসারো
সেইখানেতেই প্রেম জাগিবে আমারও।
গোপনে প্রেম রয় না ঘরে, আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ে-
সবার তুমি আনন্দধন হে প্রিয়, আনন্দ সেই আমারও॥

আমার নিজের অনুমান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পেলেন—ইউরোপে, আমেরিকায়, জাপানে, চীনে—সর্বত্র দেখা গেল তাঁর কদর, তা দেখে আমাদের ধারণা হয়েছিল যে তিনি বিশ্বকবি।

কিন্তু আমরা এখন জানি, কিছুদিনের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পশ্চিমের উন্মাদনা কমে এসেছিল, একদা-মুগ্ধরা তার নিন্দা করতেও শুরু করেছিলেন। সে সবই সমসাময়িকের উত্তেজনা, তা ঢেউয়ের মতো, তার চূড়া আছে, তার তলাও আছে, আসে যায়।

এখন রবীন্দ্রনাথের কী অবস্থা?

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে এবং পৃথিবীর যেসব এলাকায় বাঙালি আছে, তাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ আছেন, বায়ুসমুদ্রের মতো। যদি কেউ বাংলা ভাষায় কথা বলেন, পড়েন, লেখেন, তাহলে তিনি ঘোর রবীন্দ্রবিরোধী হওয়া সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথের কাছে ঋণী, কারণ বাংলা ভাষা তৈরিতেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে রবীন্দ্রনাথের। আর রবীন্দ্রনাথ বাঙালিকে দিয়েছেন গৌরববোধ, যে গৌরববোধ থেকে পূর্ব বাংলার মানুষ ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’ বলে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে এবং অবশেষে স্বাধীনতা অর্জন করে ছেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরাও বাঙালিত্বের গরিমায় ভোগেন, মাত্র সেদিন প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাসিরুদ্দিন শাহ বলেছেন, বাঙালিরা নিজেকে আলাদা ভাবে। আমি একবার ওডিশায় গিয়েছিলাম ‘মা’ বইয়ের অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশ উপলক্ষে, ওডিশার লেখকেরা বলেছেন, তাঁদের মনে হয়, কলকাতার সব লেখক মনে করেন, ১৯১৩ সালে তিনিই নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, আর সবাই সত্যজিৎ রায়ের মতো চলচ্চিত্রকার।

কিন্তু সারা পৃথিবীতে, কমপক্ষে ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় কি রবীন্দ্রনাথ নিত্যপাঠ্য? যেভাবে লোকে গ্যেটে পড়েন, তলস্তয় পড়েন, কাফকা-কামু পড়েন, এলিয়ট পড়েন, র‍্যাঁবো বা বোদলেয়ার পড়েন, হাইনরিশ হাইনে বা রিলকে পড়েন, হুইটম্যান পড়েন, সেভাবে কেউ কি আমাদের বিশ্বকবির নাম জানেন? রবীন্দ্রনাথের কবিতা কি পঠিত হয়?
এ বিষয়ে ২০১১ সালে রবীন্দ্রনাথের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত একটা প্রবন্ধ উল্লেখ করা যেতে পারে। তার শিরোনাম ছিল: Rabindranath Tagore was a global phenomenon, so why is he neglected?’

(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বৈশ্বিক ব্যাপার, কেন তাহলে তিনি উপেক্ষিত?)

এটা লিখেছিলেন আয়ান জ্যাক। তাতে তিনি বিবরণ দিয়েছেন, কীভাবে কবি ইয়েটস রবীন্দ্রনাথের কবিতার বইয়ের ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন, কীভাবে ধন্য ধন্য পড়ে গিয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, তারপর কীভাবে তারা আবার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল:
More than anything, what Tagore stood for was a synthesis of east and west. He admired the European intellect and felt betrayed when Britain’s conduct in India let down the ideal. His western enthusiasts, however, saw what they wanted to see. First, he was an exotic fashion and then he was not. “Damn Tagore,” wrote Yeats in 1935, blaming the “sentimental rubbish” of his later books for ruining his reputation. “An Indian has written to ask what I think of Rabindrum [sic] Tagore,” wrote Philip Larkin to his friend Robert Conquest in 1956. “Feel like sending him a telegram: ‘Fuck all. Larkin.'”

এখন যদি পশ্চিমে কাউকে জিগ্যেস করা হয়, রবীন্দ্রনাথ কেমন কবি ছিলেন, তাহলে এর উত্তর আসবে, আমরা জানি না, কারণ আমরা পড়িনি। কেন পশ্চিমে রবীন্দ্রনাথ পড়া হয় না, এর উত্তরে বাঙালিরা বলেন, তার ভালো অনুবাদ হয়নি—আয়ান জ্যাক বলছেন।

আয়ান জ্যাক একটা বেশ বিপজ্জনক প্রস্তাব দিয়েছেন, তাহলো আসুন, আমরা ভুলে যাই যে রবীন্দ্রনাথ কবি ছিলেন, তাঁর আরও উল্লেখযোগ্য পরিচয় আছে, আরেকটু সহজ পরিচয়, তিনি প্রাবন্ধিক ছিলেন, তিনি একটা বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেছিলেন, সন্ত্রাসবাদের সময়ে তিনি সন্ত্রাসের বিরোধিতা করেছিলেন, তিনি ছিলেন সেক্যুলার, যখন তাঁর সমাজ ছিল নানাভাবে বিভক্ত, তিনি কৃষিক্ষেত্রে সংস্কারসাধন করেছিলেন, তিনি পরিবেশবাদী ছিলেন, তিনি নারী বিষয়ে যা লিখেছেন, তাতে বোঝা যায়, তিনি তার সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। এই প্রস্তাব শুনলে সবচেয়ে বেশি মনখারাপ করতেন রবীন্দ্রনাথ নিজে।

২.

এই অপ্রিয় সত্যটা আমাদের মেনে নেওয়া উচিত যে বাংলা ভাষায় একজনও আন্তর্জাতিক লেখক নেই। একজনও না। যদিও আমাদের লেখকদের অনেকেই বিশ্বমানের। জীবনানন্দ দাশের মতো বড় কবি পৃথিবীতে কমই আছেন, অসাধারণ এক কবিকে এ পৃথিবী পেয়েছিল, কোনো দিন পায়নি আবার। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা অমিয়ভূষণ মজুমদার, কিংবা শামসুর রাহমান অবশ্যই বিশ্বমানের লেখক। কিন্তু আমাদের কোনো লেখকই বাংলাদেশের বাইরে বলবার মতো কোনো জায়গা করে নিতে পারেননি; যা পেরেছিলেন, তা ওই এক রবীন্দ্রনাথই। এখন লালনকে নিয়ে বা জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে কোথাও কোথাও একাডেমিক পর্যায়ে কিছু আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা খুবই সীমিত পর্যায়েই। আর বর্তমানকালের লেখকদের মধ্যে কেউই বাংলা ভাষায় লিখে আন্তর্জাতিক সাহিত্য অঙ্গনে কোনো গ্রহণযোগ্যতা পাননি। মহাশ্বেতা দেবীকে নিয়ে সাবঅল্টার্নবাদীরা আলোচনা করেছেন, এই রকম ব্যতিক্রম আরও একটা দুটো নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু ধরা যাক, অরুন্ধতী রায়, কিংবা ঝুম্পা লাহিড়ী কিংবা অমিতাভ ঘোষের যে আন্তর্জাতিক সাফল্য ও সুনাম আছে, তার বিন্দুমাত্রও নেই শামসুর রাহমানের কি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বা ধরা যাক, ল্যাটিন আমেরিকার লেখকেরা কিংবা জাপানের হারুকি মুরাকামি যেমন পৃথিবীর অনেক জায়গায় অনূদিত, প্রকাশিত ও পঠিত হয়, বাংলা ভাষার কোনো লেখকেরই সেই স্থান তৈরি হয়নি।

বছর কয়েক আগে আমি গিয়েছিলাম কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল লিট ফেস্টে। তারও আগে আমি যোগ দিই জয়পুর সাহিত্য উৎসবে। ফেরার পথে কলকাতার উৎসবে। সেটা হচ্ছিল কলকাতা বইমেলার সমান্তরালে। লিট ফেস্টে যোগ দেওয়া লেখকেরা থাকছেন ছয় তারকা হোটেলে, তাঁদের জন্য রঙিন পানীয়, ভালো গাড়ি, আর সার্বক্ষণিক সঙ্গীর ব্যবস্থা, আর পাশেই বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ লেখকেরা খদ্দর পরে চটি পায়ে ঘুরছেন। আমি কবি জয় গোস্বামীকে বললাম, বাংলা ভাষার লেখকদের তো মনে হচ্ছে প্রাদেশিক লেখক। কবি জয় গোস্বামী বললেন, সেটা আপনি আজ বুঝলেন, আমি দশ বছর আগেই সেটা বুঝেছি।

বাংলা ভাষার লেখকেরা কেন বাইরের পৃথিবীর পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলেন না? কারণ বাংলাদেশের কোনো আন্তর্জাতিক প্রাসঙ্গিকতা নেই। যেটা এখন ইরাকের আছে, আফগানিস্তানের আছে। জাপান আর চীন যেটা অর্জন করে নিয়েছিল। দেশ হিসেবে ভারতের তা আছে, তাদের ইংরেজিভাষী লেখকেরা বিশ্বপাঠকের সে চাহিদা পূরণ করে চলেছেন। বাংলাদেশের ব্যাপারে যে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে, তা তাহমিমা আনাম কিংবা মনিকা আলীর মাধ্যমেই নিবারণ করতে পারছে পশ্চিমারা।

এখন অনেকেই বলেন, ভালো অনুবাদের অভাবেই হাসান আজিজুল হক কিংবা দেবেশ রায় কিংবা সৈয়দ শামসুল হককে বিশ্ববাসী চিনতে পারল না। এ কথা অতিসরল। আসলে দরকার আন্তর্জাতিকভাবে প্রাসঙ্গিক হওয়া, প্রকাশনার আন্তর্জাতিক শিকলে যুক্ত হওয়া। সেটা বাংলা ভাষার কোনো লেখক হতে পারেননি। হয়তো খানিকটা হয়েছিলেন তসলিমা নাসরিন। আর কেউ হননি। হতে পারবেন, সে সম্ভাবনা আপাতত দেখি না। অনূদিত হলেই বিলেতে বা আমেরিকায় সৈয়দ শামসুল হক প্রকাশিত হবেন, প্রকাশিত হলেই লোকে তাঁর বই পড়বে, নিউইয়র্ক টাইমস কিংবা গার্ডিয়ানে লেখক আলোচিত হবেন, সে সম্ভাবনা আমি দেখি না। বিপুল কিন্তু দুঃসাধ্য সম্ভাবনা আছে অবশ্য বাংলাদেশি ইংরেজি লেখকদের।

কেউ হয়তো পাড়বেন ক্লিনটন বি সিলির জীবনানন্দ দাশবিষয়ক বইয়ের কথা, বলবেন এসেনশিয়াল ট্যাগোর বইটার খ্যাতি এবং সাফল্যের কথা। এসব বই নিয়ে আগ্রহ কেবলই একাডেমিক, তার পরিসরও সীমাবদ্ধ।

আজকের দুনিয়ায় সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি রুমি; কহলির জিবরানও হয়তো মানুষ পড়ে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ? বাঙালির বাইরে কোথাও তিনি নেই। আমাদের বিশ্বকবিরই যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে অন্যদের অবস্থা সহজবোধ্য।

তাহলে আমরা কী করব? ইংরেজিতে লিখব? রবীন্দ্রনাথ নিজে অনেক অনুশোচনা করেছিলেন ইংরেজিতে নিজের লেখা অনুবাদ করে ইংরেজি লেখক হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে। মাইকেল মধুসূদনের ‘হে বঙ্গ ভাণ্ডারে তব বিবিধরতন’ কবিতাটা তো নিত্যস্মরণীয়। আমি লিখি আমার মানুষদের জন্য, তাদের ভাগ্যের সঙ্গে আমার ভাগ্য জড়িত, তাদের কান্নাহাসির সঙ্গে আমার অশ্রু মিলেমিশে রইবে, সেখানে আমি যেন ফাঁকি না দিই। হাসান আজিজুল হকের ছোটগল্প যে বিশ্বমানের, সেটা আমরা জানলেই চলবে, পৃথিবীর লোক তা জানল কি জানল না, তা নিয়ে হাসান আজিজুল হক নিশ্চয়ই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত নন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্কাইভ

May 2017
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
আরও পড়ুন