২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ ইং | ১২ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

EN

মুক্তিযুদ্ধের তীর্থভূমি কসবা

মোবারক হোসেন চৌধুরী নাছির

প্রকাশিত: ৭:২০ অপরাহ্ণ , ২৫ মার্চ ২০১৭, শনিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 6 years আগে

কসবা কোল্লাপাথর থেকে ফিরে এসে, মোবারক হোসেন চৌধুর নাছিরঃ

ব্রা‏‏হ্মণবাড়িয়া পূর্ব প্রান্তে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিশালনগর থানার পশ্চিমে সীমান্তবর্তী কসবা উপজেলা। এই উপজেলায় সালদা, বিজনা, তিতাস, সিনাই, বুড়ি, সাঙ্গুর, কালিয়ারা নদী একে বেঁকে কসবার মধ্যে অত্রিক্রম করে গেছে। উপজেলার পূর্ব প্রান্তে রয়েছে লাল মাটির পাহাড়ি টিলা ভূমি। ছোট ছোট টিলার সবুজ বনানী আর পশ্চিম প্রান্তে সমতল ভূমির সৌন্দর্য্যরে এক ঐতিহ্যবাহী স্থান কসবা। সবুজ গাছপালার গ্রাম, পাহাড়ি টিলার সবুজ বনানীর কসবা প্রকৃতির মাঝে মহান মুক্তিযুদ্ধের সমাধিস্থান। যা মুক্তিযুদ্ধের তীর্থ ভূমি। মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত আন্দোলন প্রিয় সংগ্রামী বাঙালি জাতির সময়ের সাহসী সন্তান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। আমাদের কসবা-আখাউড়া মাটি ও মানুষের অহংকার এডভোকেট সিরাজুল হক বাচ্চু মিয়া সাহেব বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে আওয়ামীলীগকে দৃঢ় অবস্থানে পৌছাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা করার দৃঢ় প্রত্যয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে তাঁর ভূমিকা জাতি আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

কসবা অর্থ ছোট শহর বা উপশহর। এক সময় এখানে ত্রিপুরার অস্থায়ী রাজধানী ছিল। সাহিত্য, সংস্কৃতি শিক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধের তীর্থভূমি এই কসবা ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে এক গৌরবউজ্জ্বল ঐতিহ্যে দেশে-বিদেশে সকলের কাছে সর্বাধিক পরিচিতি। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে কসবা থানা বহু ছাত্র কৃষক শ্রমিক সরকারী কর্মচারী অংশগ্রহণ করেন। এ থানায় প্রায় ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হন। অন্য দিকে আহত হন ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা। কসবা থানায় পাকসেনাদের সঙ্গে বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ে দেশের বহু মুক্তিযুদ্ধা শহীদ হন। কুল্লাপাথর, আকাবপুর, শ্যামপুর, পুটিয়া, চারগাছ, শিমরাইল, ইত্যাদি স্থানে ছোট বড় আটটি স্থানে সমাধিস্থল রয়েছে। এর মধ্যে কুল্লাপাথর সমাধিস্থলই বৃহৎ। এখানে ৪৯ জনের নাম ফলকে লেখা থাকলেও অনেকে সমাধিস্থ করা হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানান। অপরদিকে লক্ষীপুর সমাধিস্থলে ১২ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সমাধিস্থ করা হয়।

 

কোল্লাপাথর সমাধিস্থলের অবস্থানঃ কসবা থানা বায়েক ইউনিয়নের ভারত সীমান্ত ঘেঁষা একটি গ্রাম কুল্লাপাথর। সীমান্তবর্তী রেল স্টেশন সালদানদী থেকে পূর্ব দিকে প্রায় ২/৩ কিলোমিটার বালুকায়ময় রাস্তা পাহাড় ও টিলার গাঁ ঘেষে কুল্লাপাথর সমাধিস্থলে গিয়ে লেগেছে। উঁচু-নিচু পাহাড় ও টিলা ইদানিং বেষ্টিত পিচ রাস্তা ও ছায়া সুনিবিড় কুল্লাপাথর গ্রাম। এ গ্রামেই ঘুমিয়ে আছে বাঙালি জাতির অহংকার-অনেক শহীদ মুক্তিযোদ্ধা।

ইতিহাসঃ- এই মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে সেক্টর কমান্ডারদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১০ম সেক্টরটি প্রধান সেনাপতির অধিনস্থ করা হয়। নৌ-কমান্ড ও সিএন্ডসি স্পেশাল বাহিনী এই সেক্টরে যুদ্ধ তৎপরতা পরিচালনা করে ২১নভেম্বর মুক্তি বাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে চুড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধের সময় সহযোগিতা করেছেন যারা, নূরজাহান বেগম, ফুলবরের নেছা, মারুফা বেগম, এদের সাথে কথা হলে দৈনিক ট্রাাইবুনাল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া টাইমস কে জানান,

এদের মধ্যে নুরজাহান বেগম (বয়সঃ১০৪ বছর) ,স্বামীঃ গাজী মোঃ ফজলুর রহামান, গ্রামঃ নয়নপুর, ডাকঃ সালদানদী, থানা- কসবা, জেলা- ব্রাহ্মণবাড়িয়া, তিনি মুক্তিযোদ্ধে নয়নপুর বাগরা সম্মুখ সমরে ফকির বাড়িতে পাক বাহীনির সাথে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমি মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সার্বিক সহযোগীতা করি। মুক্তি যুদ্ধে মন্দবাগ বাজারের সাথে ছক্কারমার পুল ছয়জন পাক বাহিনী নিহত হয় ও দুইজনকে জীবিত ধরে ভারতে পাঠিয়ে দেয়। এ যুদ্ধে মেজর খালেদ মোশারফ, মেজর ছালেক, ক্যাপ্টেন গাফফার ও সুবেদার বেলায়েত অংশগ্রহণ করেন। এবং সুবেদার বেলায়েত নিহত হন। তাহার কবর কোল্লাপাথর সায়িত আছে। নূরজাহান বেগম তিনি আগরতলাতে সিনিয়র বেসিক হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। বিজ্ঞানাগার ও পোস্ট অফিসে জায়গা দান করেন। বর্তমানে নয়নপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষানুরাগী হিসেবে জায়গা দান করেন। তিনি ত্রীপুরা নোওগাঁও সিনিয়র বেসিক হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ ছিলেন। তার ছয় ছেলে ও দুই মেয়ে। তিনি এখনও জীবত আছেন।


ফুলবরের নেছা (বয়সঃ১০২ বছর) ,বৎসর, স্বামী মৃত- আলী আজগর, সাং-নোয়াগাঁও,থানা-কসবা, জেলা- ব্রাহ্মনবাড়িয়া। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তাহার বাড়ির পুকুর পাড়ে মুক্তি যোদ্ধাদের ব্যাংকার ছিল। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক সহযোগীতা করেছেন। যুদ্ধের অনেক ঘটনা তিনি স্ব-চুক্ষে দেখেছেন বলে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পরেন।

মারুফা বেগম (বয়সঃ ৮০ বছর), বৎসর, স্বামী মৃত-মোঃ তাহের মিয়া, সাং-নোয়াগাঁও,থানা-কসবা, জেলা- ব্রাহ্মনবাড়িয়া। তাহার বাড়ির উঠোনে ও বাঁশের ঝাড়ের পাশের্^ পুকুরের চতুরপাড় মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাংকার করেছিল।
ঐ ব্যাংকার থেকে মাঝে মধ্যে মুক্তিবাহিনিরা যুদ্ধ পরিচালনা করত। তিনি সকল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার সরবরাহ ও খবরাখবর আদান প্রদান করতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের নাম জানতে চাইলে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন জোবেদ আলী, তোতা মিয়া,ফিরোজ, ফারুক,আলী মিয়া, তাদের নাম তার স্পস্ট মনে আছে। এ প্রতিনিধি মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক নাম যাচাইয়ের জন্য মুক্তিযোদ্ধা অফিসে সন্ধান নিলে তারা সঠিক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাদের নাম তালিকায় পাওয়া যায়।
এর মধ্যে কসবায় মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ২নং সেক্টর আওতাভুক্ত ছিল। ২নং সেক্টর অধিনায়ক খালেদ মোশারফ ছিলেন। কোল্লাপাথর, খাদলা, মাদলা, বেলতলীসহ বহু গ্রাম ছিল মুক্তাঞ্চল। মুক্তিযোদ্ধাদের অবাধ বিচরণ ছিল এ সমস্ত গ্রামসমূহে। খালেদ মোশারফের একান্ত ইচ্ছা ছিল শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বাংলাদেশের ভূখন্ডে একটি পৃথক সমাধিস্থল গড়ে তোলা। সালদানদী সাব সেক্টরে তখন তুমুল যুদ্ধ। এই যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন হাবিলদার তৈয়ব আলী। যুদ্ধ শেষে সাব সেক্টর কমান্ডার তৎকালীন ক্যাপ্টেন আবদুল গাফফার সহযোদ্ধার মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা করিমের পিতা মরহুম আ: মান্নান দান করলেন ৬৫ শতক ভূখন্ড। যুদ্ধে বহু শহীদকে এখানে সমাধিস্থল করা হয়। এভাবেই গড়ে উঠে বাংলার মুক্তি সংগ্রামের অমূল্য স্মৃতি কোল্লাপাথর সমাধিস্থল। কসবায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বীর উত্তম খেতাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত ছয় জন রয়েছে ।
এখানে যাদেরকে সমাধিস্থল করা হয় সেই সকল বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা হলেন- (১) সিপাহী দর্শন আলী, (২) মো: জাকির হোসেন (৩) আবদুল জব্বার, (৪) হাবিলদার তৈয়ব আলী, (৫) নায়েক আবদুস সাত্তার, (৬) সিপাহী আব্বাস আলী, (৭) মো: ফারুক আহাম্মদ, (৮) মো: ফখরুল আলম, (৯) মোজাহদী নূর মিয়া, (১০) নায়েক মোজাম্মেল হক, (১১) নায়েব সুবেদার মো: আবদুর সালাম, (১২) নোয়াব আলী, (১৩) সিপাহী মোসলেম মৃধা, (১৪) প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম, (১৫) মো: আবদুল ওদুদ, (১৬) সিপাহী আজিম উদ্দিন, (১৭) মতিউর রহমান, (১৮) মোশারফ হোসেন, (১৯) নায়েব সুবেদার মাইনুল ইসলাম, (২০) সিপাহী নূরুল হক, (২১) মো: আবদুল কাইয়ুম, (২২) সিপাহী হুমায়ুন কবির, (২৩) ল্যান্স নায়েক মো: আবদুল খালেক, (২৪) ল্যান্স নায়েক আজিজুর রহমান, (২৫) মো: তারু মিয়া, (২৬) নায়েক সুবেদার বেলায়েত হোসেন, (২৭) মো: রফিকুল ইসলাম, (২৮) মো: মোরশেদ মিয়া, (২৯) শ্রী আশোতোষ রঞ্জন দে, (৩০) মো: তাজুল ইসলাম, (৩১) মো: শওকত, (৩২) মো: আবদুস সালাম সরকার, (৩৩) মো: জাহাঙ্গীর, (৩৪) আমীর হোসেন, (৩৫) শ্রী পরেশ চন্দ্র মল্লিক, (৩৬) মো: জামাল উদ্দিন, (৩৭) মো: আবদুল আওয়াল, (৩৮) মো: আবেদ আহাম্মেদ, (৩৯) মো: সিরাজুল ইসলাম, (৪০) মো: ফরিদ মিয়া, (৪১) মো: মতিউর রহমান, (৪২) মো: সাকিব মিয়া, (৪৩) মো: আবদুর রশীদ, (৪৪) আনসার এলাহী বক্স, (৪৫) সিপাহী শাহিদুল হক, (৪৬) সিপাহী আনোয়ার হোসেন, (৪৭) মো: আবদুল বারী, (৪৮) অজ্ঞাত ও (৪৯) অজ্ঞাত।
লক্ষীপুর শহীদ সমাধিস্থলঃ
কুল্লাপাথরের পরেই এ থানায় যে সমাধিক্ষেত্রটি পরিচিত পেয়েছে সেটি হল লক্ষীপুর শহীদ সমাধিস্থল। মাত্র ১২ জন বীর শহীদের কবর এখানে। কসবা থানা সদর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে সীমান্তের পার্শ্বের এক প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে এই সমাধিস্থল। অত্যন্ত বড়মাপের সমর নায়ক ২ নম্বর সেক্টরের প্রধান খালেদ মোশারফের নির্দেশে এই সমাধি ক্ষেত্রটি গড়ে উঠে। তৎকালীন সাব সেক্টর কমান্ডার আইন উদ্দিন, গ্রুপ কমান্ডার নাজির হোসেনের নেতৃত্বে লতুয়ামুড়া, চন্ডিদ্বার, কসবা, বগাবাড়ী, আকবপুর ইত্যাদি, এর মধ্যে বগাবাড়ীর আঃ ওহাব মিয়াার বাড়িতে মুক্তিবাহীনি ব্যাংকার করে পাক সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেছে বলে জানা যায়। এ সমস্ত এলাকায় সম্মুখ সমরে যারা শহীদ হয়ে ছিলেন তাদেরকে এখানেই সমাধিস্থ করা হয়েছে। এ সমাধিস্থলে সমাধিস্থ আছেন। (১) ল্যাফন্টেনেন্ট আজিজুল হক, (২) সুবেদার আবুল হোসেন, (৩) হাবিলদার আবদুল হাকিম, (৪) হাবিলদার আবুল কাসেম, (৫) নায়েক আবুল কালেম, (৬) ল্যান্স নায়েক নূরুল হক, (৭) সিপাহী আবেদ আলী, (৮) সিপাহী এনামুল হক, (৯) সিপাহী আবুল কাসেম, (১০) সিপাহী বুরহান উদ্দীন, (১১) সিপাহী রফিকুল ইসলাম, (১২) সিপাহী আবদুর রাজ্জাক।
সকল শহীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। খন্ড খন্ড শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবর যেখানে রয়েছে সকল কবর একত্রিত করে কোল্লাপাথর শহীদ সমাধীস্থলে স্থানান্তর করার আহব্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী। জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর সু-যোগ্য কন্যা জননেত্রী মাননীয় প্রধান মন্ত্রী গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণের জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালনে জাতী আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে। তাই এই শহীদদের স্মৃতীকে আরও স্মৃতিময় করার জন্য কসবা উপজেলাবাসীর প্রাণের দাবী। সাংবাদিক , মানবাধিকার কর্মী, লেখক কলামিস্ট।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্কাইভ

March 2017
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
আরও পড়ুন